সুজানগরে দুই স্কুলছাত্রীকে গণধর্ষণ, পাঁচজন গ্রেপ্তার

পাবনার সুজানগরে দুই স্কুলছাত্রীকে গণধর্ষণের পর ইন্টারনেটে ভিডিও প্রকাশ করার ঘটনায় ৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। অপরদিকে এই ঘটনার প্রতিবাদে ফুঁসে উঠেছে ওই দুই স্কুলছাত্রীর সহপাঠীরা।

ধর্ষকদের শাস্তির দাবিতে আজ সোমবার দুপুরে বিদ্যালয়ের সামনে মানববন্ধন ও সড়ক অবরোধ করে তারা।

পুলিশ জানায়, গত রোববার বিকেলে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের ভারপ্রাপ্ত বিচারক অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. ইমরান হোসেন চৌধুরীর আদালতে নির্যাতিত ছাত্রীরা মামলা করে। এরপর আদালত পুলিশকে এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়।

আদালতের ওই নির্দেশের পরে আজ সোমবার ভোররাতে ও দুপুরে পথক স্থান থেকে এ ঘটনার সঙ্গে জড়ির অভিযোগে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন চর ভবনীপুর মাস্টারপাড়া এলাকার হযরত আলী, আল আমিন, মো. মিঠুন, পাংকু ও সোহেল রানা। পরে এই পাঁচজনকে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়।

এদিকে সুজানগরে দুই ছাত্রীকে গণধর্ষণ ও ভিডিওচিত্র ইন্টারনেটে ছেড়ে দেওয়ার প্রতিবাদে মানববন্ধন করেছে তাদের সহপাঠীরা। তারা এই ঘটনার দষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করে এবং একই সঙ্গে বিদ্যালয়ে যাওয়া আসার পথে নিরাপদ পরিবেশের দাবি জানায় শিক্ষার্থীরা।

এদিকে এ ধর্ষণ মামলার আইনজীবী রাজিউল্লাহ সরদার রঞ্জু মামলার আর্জির বিবরণ উল্লেখ করে জানান, ধর্ষণের শিকার অষ্টম শ্রেণির ওই দুই ছাত্রীর বাড়ি সুজানগর পৌর এলাকায়। গত ১ আগস্ট বিকেলে স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে ছয় বখাটে চরভবনীপুর মাস্টারপাড়ার হযরত আলী, আল আমিন, শাহিন, মিঠুন, পাংকু ও সোহেল রানা অস্ত্র দেখিয়ে ওই দুই ছাত্রীকে পাশের নিকিরিপাড়ার একটি বাঁশ বাগানে নিয়ে যায়। সেখানে বখাটেরা দুই ছাত্রীকে ধর্ষণ করে এবং মোবাইল ফোনে তার ভিডিও চিত্র ধারণ করে। ঘটনাটি কাউকে জানালে ধর্ষণের ভিডিও ইন্টারনেটে ছেড়ে দেওয়ার হুমকিও দেয় ধর্ষকরা।

দুই ছাত্রী ভয়ে বিষয়টি গোপন রাখে। ঘটনার কয়েক দিন পর ভিডিও চিত্র দেখিয়ে পুনরায় তাদের সঙ্গে যাওয়ার প্রস্তাব দিলে তারা তা প্রত্যাখ্যান করে। এরপর বখাটেরা ওই ভিডিও ফেসবুকে আপলোড করলে মুহূর্তে তা ছড়িয়ে পড়ে। বিষয়টি জানাজানি হলে ওই দুই ছাত্রীর অভিভাবকরা সুজানগর থানায় বখাটেদের বিরুদ্ধে মামলা করতে যান। পুলিশ মামলা গ্রহণ না করে তাঁদের ফিরিয়ে দেয় বলে তাঁরা অভিযোগ করেন।

পরে বিষয়টি নিয়ে সুজানগর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পৌর মেয়র আলহাজ আবদুল ওহাবের কাছে ওই দুই ছাত্রীর দরিদ্র বাবা-মা দাবি করলেও তিনি কৌশলে সালিশি বৈঠকের মাধ্যমে সময়ক্ষেপণ করেন। একপর্যায়ে বাধ্য হয়েই তাঁরা আদালতে মামলাটি করেন।

ধর্ষণের শিকার ওই দুই ছাত্রী জানায়, এই ঘটনার পর থেকে বখাটেদের হুমকির মুখে তারা বাড়ির বাইরে যেতে পারছে না এবং কাউকে মুখ দেখাতে পারছে না। সুষ্ঠু বিচার না পেলে তাদের আত্মহত্যা করা ছাড়া কোনো উপায় নেই।

এ বিষয়ে ওই দুই ছাত্রীর বাবা-মা জানান, তাঁরা গরিব মানুষ। বখাটেরা প্রভাবশালী আওয়ামী লীগের পরিবারের সন্তান ও পৌর মেয়রের ক্যাডার। এ কারণে পুলিশ ও মেয়রের কাছ থেকে তাঁরা কোনো বিচার পাননি। এ ঘটনার পর থেকে তাঁরা সমাজে মুখ দেখাতে পারছেন না। আদালতের কাছে ধর্ষকদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানান তাঁরা।

সুজানগর পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহিনুজ্জামান শাহিন বলেন, ‘বখাটেরা পৌর মেয়র আবদুল ওহাবের ক্যাডার হওয়ার কারণে পুলিশ মামলাটি গ্রহণ করেনি। আমরা কোর্টে মামলা করার পরামর্শ দিয়েছি তাঁদের। এই ঘটনার পর থেকেই ওই দুই ছাত্রী বিদ্যালয়ে আসা বন্ধ করে দিয়েছে। তারা চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছে।’ এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবি করেন তিনি।

এ প্রসঙ্গে সুজানগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ওবায়দুল হক বলেন, ‘এ ধরনের কোনো অভিযোগ কেউ আমাদের কাছে নিয়ে আসেনি। অভিযোগ পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

যোগাযোগ করা হলে সুজানগর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও পৌর মেয়র আবদুল ওয়াহাব গণধর্ষণের সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, ‘মেয়ে দুটির অভিভাবকরা আমার কাছে এসেছিলেন। এটা নিয়ে কয়েক দফা সালিশ বৈঠকও হয়েছে, কিন্তু কোনো সমাধান হয়নি।’

বখাটেরা তাঁর কর্মী-সমর্থকের বিষয়টি অস্বীকার করে মেয়র বলেন, ‘তারা আওয়ামী পরিবারের ছেলে হলেও তারা আমার লোক নয়। এ ঘটনার সঙ্গে আমাকে জড়িয়ে একটি মহল আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অপপ্রচার চালাচ্ছে।’

You May Also Like

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: